ছবি : ১১ দলীয় জোটের পদযাত্রায় সরকার পতনের নতুন সুর
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যাঁদের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে তাঁরাই রাষ্ট্রের বৈধ সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে আবার নির্বাচন হয় এবং ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে সরকারের নীতি, কর্মকাণ্ড কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিবাদে রাজপথে আন্দোলন করাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। বিরোধী দল ও নাগরিকদের সরকারের সমালোচনা এবং দাবি আদায়ে আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। প্রশ্ন তৈরি হয় তখনই, যখন নির্বাচনের বাইরে রাজপথের কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়।
সম্প্রতি ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখী পদযাত্রা এই বিতর্ককে সামনে এনেছে। দীর্ঘ সড়কজুড়ে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি এবং সমাবেশে দেওয়া বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। জোটের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ছয় দফা দাবির মধ্যে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার মতো বিষয় রয়েছে।
এসব দাবির অনেকগুলোই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে সরকারকে এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দাবিগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং সেই দাবিকে কেন্দ্র করে সরকার পরিবর্তনের সময়সীমা নির্ধারণ নিয়েই মূল বিতর্ক।
বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যাপক জনসমাগম কোনো দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও মাঠের শক্তির পরিচয় দিতে পারে। তবে একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা দিয়ে পুরো দেশের জনমত নির্ধারণ করা যায় না। কারণ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও শ্রেণি-পেশার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত দেন।
রাজপথের আন্দোলন এবং নির্বাচনের ভোট—দুটিই গণতান্ত্রিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু তাদের ভূমিকা এক নয়। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে কোনো দাবি মানতে চাপ দেওয়া যেতে পারে; অন্যদিকে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ নির্ধারণ করেন কে সরকার পরিচালনা করবেন।
এই দুইয়ের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদের ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের বক্তব্যের পর ‘ডিসেম্বর’ এখন রাজনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বানও ছিল।
অন্যদিকে এনসিপির নেতা নাহিদ ইসলাম ছয় দফা দাবিকে এক দফায় রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে কর্মসূচিতে আলোচনা হয়েছে। আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণাও এসেছে জোটের নেতাদের কাছ থেকে।
এ অবস্থায় ডিসেম্বরের সময়সীমা বাস্তবে কী অর্থ বহন করছে, সেটিই এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটি কি সরকারকে চাপ দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল, নাকি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে ক্ষমতা পরিবর্তনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বক্তব্যে ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটির ব্যবহার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব, নাগরিক সেবা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি কিংবা সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের অসন্তোষ থাকতেই পারে। এসব বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করাও স্বাভাবিক।
তবে সরকারের কোনো নীতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে সরাসরি ‘ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ ফ্যাসিবাদ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ধারণা। রাজনৈতিক বিতর্কে শব্দটির অতিরিক্ত ব্যবহার হলে এর অর্থ ও গুরুত্ব দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
একই সঙ্গে যারা কর্তৃত্ববাদ বা প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তুলছেন, ক্ষমতায় গেলে তাঁরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীন রাখবেন—সেটিও জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন সমীকরণ নিয়েও আলোচনা তৈরি করেছে।
জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া দলটির রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে হলে দলটিকে রাজনৈতিক আচরণ, প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির প্রশ্নে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।
অন্যদিকে জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উঠে আসা এনসিপি শুরু থেকেই প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলেছে। পরিবারতন্ত্র, দখলদারিত্ব ও প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিও তাদের বক্তব্যে এসেছে।
এখন জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একই কর্মসূচিতে এনসিপির অংশগ্রহণের ফলে তাদের ‘নতুন রাজনীতি’র অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক জোট ও কৌশল পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও সেই পরিবর্তন তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। অতীতে বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘিরে নানা বিতর্ক সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
তবে একটি দেশের সরকার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল সিদ্ধান্ত দেশের জনগণের হাতেই থাকা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিযোগিতা, আন্দোলন, নির্বাচন ও ক্ষমতার পরিবর্তন—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়া প্রয়োজন দেশের নাগরিকদের মতামত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।
ডিসেম্বরকে ঘিরে অলি আহমদের দেওয়া সময়সীমা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আনে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকার পরিবর্তনের পথটি কী হবে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের জয়-পরাজয় একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। বিরোধী দল আন্দোলন করবে, সরকারের সমালোচনা করবে এবং জনগণের সমর্থন চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে জনগণ নির্বাচনের সময় ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের দল বা প্রার্থীকে বেছে নেবেন।
তাই রাজপথে বড় সমাবেশ যেমন রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ, তেমনি ভোটের বাক্সও জনমতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ। রাজপথের আন্দোলন যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রতিস্থাপন করে, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই ‘ডিসেম্বর’ কেবল একটি সম্ভাব্য সময়সীমার নাম নয়; এটি আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কে? জনগণ ও তাদের ভোট, নাকি রাজপথের রাজনৈতিক শক্তি? গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এই প্রশ্নের উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মতামত