ছবি : মনির হোসেন, শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
রংপুর। আটটি জেলা নিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্রের মাথা জুড়ে যার অবস্থান। দেশের কৃষিজ পণ্যের মূল যোগানদাতা। ফকির সন্ন্যাসী, সান্তাল, তেভাগা,কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে যার ঐতিহ্য। আন্দোলন সবগুলোই ছিল বৈষম্য বন্ধ নিয়ে।কিন্তু বৈষম্য রোধ হয়নি। ব্রিটিশ, পাকিস্তান আমলে যেমন রংপুরের প্রতি কেন্দ্রের অনীহা ছিল; তেমনি ছিলো স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশেও। ২৪'র গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী জন-আকাঙ্ক্ষা কি রংপুরে বাস্তবায়ন হবে?
এক.
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাজেটের খুবই কম অংশ পায় রংপুরবাসী। উন্নয়ন বাজেট আরও কম। বছর বছর নদীভাঙন কুড়িগ্রামের জনজীবন বিপর্যস্ত। এককালের মঙ্গা সমস্যা লাঘব হলেও এ জনপদের মানুষের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। না ঘটার কারণ অনেক। যার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো রংপুর অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সদিচ্ছা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির তাগিদে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব। ঢাকা,চট্টগ্রাম, বৃহত্তর কুমিল্লা, খুলনার জেলাসমূহ স্বাধীনতাত্তোর যে-রকম আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটেছে ;রংপুর অঞ্চলে তা হয়নি। অথচ ভূমি, জলবায়ু, কর্মক্ষম মানুষ এ অঞ্চলে উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। কিন্তু কোনকালেই তা হয়নি। কেউ দৃঢ়ভাবে তাকিয়েও দেখেনি।
দুই.
রংপুর দীর্ঘদিন বৈষম্য শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব। সমুদ্র বন্দর বা বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সাথে সরাসরি রেল যোগাযোগ নেই। এবং কেন্দ্রে ঢাকার সাথে অবিচ্ছেদ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা আছে। বিভিন্ন অঞ্চলের গ্যাস বাসাবাড়ি, শিল্পোৎপাদনে যেভাবে অন্যান্য জেলায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রংপুরে এ প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ নেই। কিন্তু ঠিকই দিনাজপুরের কয়লা বিক্রি ও ব্যবহার হচ্ছে অন্যত্র। এখানকার মানুষ সস্তায় শ্রম বিক্রি করছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম পাশ্ববর্তী জেলাগুলোতে যেখানে কর্মসংস্থান আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও স্থানীয় ব্যবসা ছাড়া এখানে অন্যকোনো খাতের অগ্রগতি গত তিপ্পান্ন বছরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন কোনো সরকারই করেনি। শুধু রাস্তা-ঘাট,হাটবাজার পাকা ছাড়া।এসব পাকা রাস্তাঘাট তো সামষ্টিক উন্নয়ন না। এগুলো অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক; কিন্তু একে কেন্দ্র করে অন্যকোনো পদক্ষেপ; যা এ অঞ্চলের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নে দীর্ঘ মেয়াদী ভূমিকা পালন করবে তা অনুপস্থিত।
রংপুরের প্রতি বৈষম্য কমবে -
অসম্ভব,অপরিবর্তনীয় বলতে কিছু নেই। মানুষ পরিবর্তন চাই। অবশ্যই পরিবর্তন সম্ভব। এ অসম্ভবকে সম্ভব করতে হলে প্রথমত আঞ্চলিক বৈষম্যরোধে গণঅভ্যুত্থানত্তোর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন। বিশেষত শিল্পখাত, প্রশাসনিক, সেবা,উৎপাদন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য খাত গুলোকে সারাদেশে প্রতিটির উপযুক্ত আবহাওয়া,ভূমি, জলবায়ু, যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুকূলে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এর মধ্যে রংপুর খাদ্য, কৃষিজ, জনশক্তি রপ্তানি, ছোট ও মাঝারি শিল্পোৎপাদনের মূল জায়গা হতে পারে। হতে পারে এই কারণে যে, এখানকার ভূমি, আবহাওয়া, স্থানীয় শ্রমশক্তির যোগান বাংলাদেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের মতো প্রাকৃতিকভাবে প্রতিকূল নয়, অনূকূল। ঝড়,জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়; এমনকি ভূমিকম্প থেকেও এ অঞ্চল অবস্থানগত অত্যন্ত উপযোগী ও প্রাকৃতিকভাবে নিরাপদ। এই আর্থিক ও উন্নয়ন বৈষম্যের বিরুদ্ধে ২০ জানুয়ারি ও ১৮ ফেব্রুয়ারি,১৯৬৯ ছাত্র আসাদ এবং শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা'র আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ঘটেছিল ৬৯'র গণঅভ্যুত্থান,যার পরবর্তী ফসল মুক্তিসংগ্রাম। কিন্তু বৈষম্য কমেনি। এর ২১ বছর পর একই বৈষম্যের বিরুদ্ধে ২৭ নভেম্বর, ১৯৯০ ডা: মিলন'র,ছাত্র দিপালী, কাঞ্চন প্রভৃতি ছাত্রদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই ৯০'র গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু বৈষম্য তারপরও কমেনি। একই পথে সমস্ত বৈষম্যের বিরুদ্ধে ৩৪ বছর পর ১৬ জুলাই, ২০২৪ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ'র আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সংগঠিত হয়েছে ২৪'র গণঅভ্যুত্থান। সবগুলোই হয়েছে বৈষম্য বন্ধে। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ (রবীন্দ্রনাথ)। বিশ্বাস না হারিয়ে আস্থায় চাই রংপুরের প্রতি আঞ্চলিক বৈষম্য বন্ধ হোক।
মতামত