আর মাত্র কয়েক দিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর এই নির্বাচনকে সামনে রেখে সংসদীয়-১১ দিনাজপুর-৬ আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। (হাকিমপুর, ঘোড়াঘাট, নবাবগঞ্জ ও বিরামপুর) এই চার উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে দীর্ঘদিন ধরে জামায়াত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগের আধিপত্য থাকলেও দীর্ঘ দিন ধানের শীষ প্রতীকের জয়লাভ করাতে এবারের নির্বাচনে বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘ দিন পরে এই আসনে বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষকে জয়লাভ করাতে মরিয়া বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী এই আসন ধরে রাখতে চায়। দিনাজপুর-৬ এ জমজমাট নির্বাচনি লড়াই জমে উঠেছে।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৬৯২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৭৯ হাজার ৫৯৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৩ জন। এই আসন ৬৮৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই আসনে রয়েছে ৩টি পৌরসভা ও ২৩টি ইউনিয়ন পরিষদ। ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় ভৌগোলিকভাবেও আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের নির্বাচনে এ আসনে মোট সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডাঃ এজেডএম জাহিদ হোসেন। জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম। জাতীয় পার্টির প্রার্থী লাঙ্গল প্রতীকে রেজাউল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নূর আলম সিদ্দিকী হাতপাখা প্রতীকে, বাসদের প্রার্থী আব্দুল হাকিম মই প্রতীকে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীকে আব্দুল্লাহ নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। তবে প্রশাসনের নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে ঘোড়া প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহনেওয়াজ ফিরোজ শুভ শাহ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
নির্বাচনি প্রচারণা মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরাই মূলত সক্রিয় রয়েছেন নির্বাচনি মাঠে। অন্য দলের প্রার্থীদের প্রচার তৎপরতা তেমন চোখে পড়েনি। ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের মাইকিং ও মাঝে মধ্যে হাট বাজারে প্রচারণায় তাদের উপস্থিতি খুব সীমিত।
স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে আওয়ামী লীগ ছয়বার এবং জামায়াত দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। অন্য দিকে ১৯৮৬ সালের বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে এবারের লড়াই করছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডাঃ এজেডএম জাহিদ হোসেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগ এবারের নির্বাচনে না থাকায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, জামায়াতের জন্য মাঠ তুলনামূলক সহজ হবে। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী অধ্যাপক ডাঃ জাহিদের সক্রিয় প্রচারণা সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি ও তাঁর নেতাকর্মীরা। বিএনপি নেতাকর্মীরা শতভাগ বিজয়ের আশা করছেন এবং নির্বাচিত হলে তাঁকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান বলে জানান তারা। অন্য দিকে বিএনপির চেয়ারম্যান দেশনায়ক তারেক রহমান আগামীকাল ৭ ফেব্রুয়ারী দিনাজপুর-৬ আসনের বিরামপুরে ধানের শীষ প্রতীকের নির্বাচনি পথসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে দলীয় সুত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়াও তারেক রহমানের জনসভা স্থল ইতিমধ্যে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, স্থানীয় প্রশাসন সহ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ধানের শীষ প্রতীকের কান্ডারী অধ্যাপক ডাঃ এজেডএম জাহিদ হোসেন পরিদর্শন করেছেন।
অন্যদিকে আসন পুনরুদ্ধার ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জামায়াতে ইসলামী। ইতিমধ্যে দিনাজপুর বড় মাঠে জামায়াতে আমীর ডাঃ শফিকুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম কে দিনাজপুর-৬ আসনের সাধারণ জনগণের হাতে তুলে দিয়েছেন। এবারে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী দলীয় নেতা-কর্মীরা। জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি মাত্র ৮৫৮ ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন। এবারে জনগণ ন্যায়ের পক্ষে রায় দেবে বলে জামায়াতে ইসলামী দলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা।
উভয় দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিলি স্থলবন্দরের উন্নয়ন, চার উপজেলার রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
দিনাজপুর-৬ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের কান্ডারী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডাঃ এজেডএম জাহিদ হোসেন নির্বাচনি মাঠে ও পথসভায় বলেন, ইতিমধ্যে এই আসনের চার উপজেলায় ৩ টি পৌরসভা ও ২৩ টি ইউনিয়নে সাধারণ জনগণের সাথে মিশেছি এবং তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দেখে আমি জয়ের বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী।
অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের কান্ডারী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসের শূরা সদস্য মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী সরকারের জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছি। এছাড়াও দীর্ঘহ দিন ধরে সজেলা আমীর ও হাকিমপুর উপজেলা জামায়াতেরহ আমীর সহ সংগঠনের বিভিন্ন দ্বায়িত্ব পালন করে এসেছি। এবারের নির্বাচন মাঠে দলীয় নেতা-কর্মী সহ সাধারণ জনগণের যে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দেখেছি তাতে আমি জয়ের বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী।
হাকিমপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক মোঃ ফেরদৌস রহমান বলেন, অতীতে বিএনপি-জামায়াত জোট থাকায় জামায়াত প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের পরে এবার বিএনপি দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করছে এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও ইতিমধ্যে দিনাজপুর-৬ আসনে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করে এই আসনের চার উপজেলাকে হসপিটালে পরিনত করেছেন।
অপরদিকে হাকিমপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর আমিনুল ইসলাম বলেন, গত ১৭ বছর ধরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী সরকারের জুলুম নির্যাতন সহ্য করে জামায়াত প্রার্থী এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলেন। তাই ভোটাররা এবার দাঁড়িপাল্লাকেই বিজয়ী করবেন বলে তিনি দাবি করেন।
এলাকার একাধিক ভোটার জানান, অতীতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আমলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। ডা. জাহিদ নির্বাচিত হলে মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তাঁরা উন্নয়নের আশায় ধানের শীষে ভোট দিতে আগ্রহী।
বিএনপি প্রার্থী ডা. এ জেড এম জাহিদ বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশ গড়তে জনগণের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়ে তাঁকে জয়যুক্ত করবেন।
দিনাজপুর-৬ আসনে এবারের নির্বাচন তাই জমে উঠেছে দ্বিমুখী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেখানে জামায়াতের পুরনো প্রভাবের মুখে বিএনপি হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।
মতামত